মাহে রমজানে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

You are currently viewing মাহে রমজানে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

মাওলানা মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি

______________________________

প্রাককথন:
ই’তিকাফ মাহে রমজানের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মাহে রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করা সুন্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই ই’তিকাফ করতেন। সাহাবায়ে কেরামগণও ই’তিকাফ করতেন। ই’তিকাফের মাধ্যমে মুসলমানগণ আল্লাহর জিকির ও ইবাদতের মাধ্যমে শবে কদরের রাতকে তালাশ করে। সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করে থাকে। আজকের প্রবন্ধে ই’তিকাফের ফজিলত ও তাৎপর্যসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

ই’তিকাফের পরিচয়:
ই’তিকাফ আরবি শব্দ। এর সাধারণ অর্থ অবস্থান করা। শরীয়তের পরিভাষায় ই’তিকাফ বলা হয়, পুরুষের জন্য নিয়তসহ এমন মসজিদে অবস্থান করা যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। আর মহিলাদের ই’তিকাফ হলো নিয়ত সহকারে ঘরের ভিতরে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা।

ই’তিকাফের প্রকার:
ই’তিকাফ তিন প্রকার। যথা
১. ওয়াজিব
২. সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ
৩. মুস্তাহাব
নিম্নে এই তিন প্রকার ই’তিকাফের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো

ওয়াজিব ই’তিকাফ:
ওয়াজিব ই’তিকাফ হলো, মান্নাতের ই’তিকাফ অর্থাৎ কেউ যদি মান্নাত করে আমার কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন হলে আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ার্থে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ই’তিকাফ আদায় করবো। কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়ে গেলে অবশ্যই ই’তিকাফ আদায় করে দিতে হবে। এই ই’তিকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত। রোজা ব্যতীত এই ই’তিকাফ আদায় হবেনা।

সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ:
সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ই’তিকাফ হলো, মাহে রমজানের শেষ দশকের ই’তিকাফ। এই মহল্লাবাসীর পক্ষ কমপক্ষে একজন মানুষ হলেও আদায় করতে হবে নতুবা সকলেই গুনাহগার হিসেবে গন্য হবে।

মুস্তাহাব ই’তিকাফ:
মুস্তাহাব ই’তিকাফ হলো, কিছুক্ষণের জন্য ই’তিকাফের নিয়্যত করে মসজিদে অবস্থান করা। এটা অত্যন্ত বরকতময় ও সাওয়াবের কাজ‌‌‌। স্বাভাবিকভাবে সকলেই মসজিদে প্রবেশ করার সময় ই’তিকাফের নিয়্যত করলে ই’তিকাফও আদায় হবে, সাওয়াব পাওয়া যাবে।

মাহে রমজানের শেষ দশকের ই’তিকাফের বিধান:
মাহে রমজানের শেষ দশকে অর্থাৎ বিশ রমজান নিয়্যত সহকারে সূর্যাস্তের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখার পূর্ব পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা বা ই’তিকাফ করাই হলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়াহ অর্থাৎ মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে একজন ব্যক্তি ই’তিকাফ করলে সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে অর্থাৎ সবাই দায়মুক্ত হয়ে যাবে এবং মহল্লাবাসীর কেউ যদি ই’তিকাফ না করে,তাহলে সবাই গুনাহগার হবে।

ই’তিকাফের ফজিলত:
ই’তিকাফ দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ হয়। নবীজি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা মাহে রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহে রমজানের শেষ দশকে আজীবন ই’তিকাফ করতেন।
(তিরমিজি:৭৯০)

ই’তিকাফকারীর জন্য হজ্ব ও ওমরার সাওয়াব:
ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করেন, হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মাহে রমজানের শেষ দশদিন ই’তিকাফ থাকবে সে যেন দুটি হজ্ব ও দুটি ওমরা করেছে।
(আল্লামা শা’রানী (রা.), কাশফুল গুম্মাহ,খন্ড-১, পৃষ্ঠা-২১২)

ই’তিকাফকারী আল্লাহর মেহমান:
যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মাহে রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করে, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা মেহমান হিসেবে গ্রহণ করেন। তখন তারা যা দোয়া করে আল্লাহ তাআলা কবুল করেন। যেমন হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,ই’তিকাফকারী ই’তিকাফের কারণে গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে যায় এবং সমস্ত নেকীর সাওয়াব অর্জন করেন।
(মুফিকুদ্দিন আল কুদামা: আল-মুগনী:৩/৪৫৫)

ই’তিকাফকারীর জন্য জান্নাতে মহল তৈরি:
যারা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের আরাম-আয়েশ এবং আলিশন ঘরবাড়ি ত্যাগ করে অল্প সময়ের জন্য মসজিদে ই’তিকাফ করবে আল্লাহ তাআলা বেহেশতে তাদের জন্য মনোরম মহল তৈরি করবেন। যেমন হাদিস শরীফে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে জামাত প্রতিষ্ঠিত হয় এমন মসজিদে ই’তিকাফ থাকবে নামাজ এবং কোরআন তিলাওয়াত ব্যতীত কোনো কথা বলবে না তাদের জন্য বেহেশতে মহল তৈরি করা আল্লাহ তাআলার দায়িত্ব হয়ে যাবে।
(আল্লামা শা’রানী (রা.), কাশফুল গুম্মাহ,খন্ড-১, পৃষ্ঠা-২১২)

ই’তিকাফের শর্তাবলী:
১.নিয়ত করা, ই’তিকাফের শর্তাবলী মধ্যে অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে নিয়ত করা। নিয়ত ব্যতীত সারাজীবন মসজিদে অবস্থান করলেও ই’তিকাফ হবে না।
২. এমন মসজিদে ই’তিকাফ করা যেখানে পাঁচওয়াক্ত নামাজের নিয়মিত জামাত হয়। জাওয়াহিরুল ফিকহ গ্রন্থে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট ইমাম ও মুয়াজ্জিন যারা পাঁচওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা হয় এমন মসজিদ ছাড়া ই’তিকাফ শুদ্ধ হবে না।

ই’তিকাফ শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত সমূহ:
ই’তিকাফ শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে দুটি।
১.মুসলমান হওয়া
২.জানাবত ও হায়েয-নিফাস থেকে পবিত্র হওয়া।
ই’তিকাফের জন্য বালিগ হওয়া শর্ত নয়, তাই নাবালিগের ই’তিকাফও শুদ্ধ ও আদায় হবে। আর মহিলাদের ক্ষেত্রে ই’তিকাফের জন্য স্বামীর অনুমতি নিতে হবে, স্বামীর অনুমতি ছাড়া ই’তিকাফ শুদ্ধ হবে না।

ই’তিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান:
ই’তিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো মসজিদে হারাম, অতঃপর মসজিদে নববী এরপর বায়তুল মুকাদ্দাস, তারপর জামে মসজিদ এবং এরপর সে মসজিদে মুসল্লি সংখ্যা বেশি হয়। মহিলারা নিজ গৃহের এক কোণায় নামাযের স্থানে ই’তিকাফ করবে।

ই’তিকাফ ভঙ্গের কারণ সমূহ:
পুরুষেরা বিনা ওযরে মসজিদ থেকে বের হতে পারবে না। পুরুষেরা বিনা ওযরে মসজিদ থেকে বের হলে সাথে সাথে ই’তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে প্রস্রাব, পায়খানা এবং জামে মসজিদে জুমার উদ্দেশ্যে বের হওয়া যাবে। অনুরূপভাবে মসজিদ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে অথবা কেউ জোরপূর্বক মসজিদ থেকে বের করে দিলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য মসজিদে প্রবেশ করলে ই’তিকাফ ভঙ্গ হবে না। সহবাসের দিকে আকর্ষণ করে এমন কাজ দিনের বেলায় হোক কিংবা রাতের বেলায় হোক ই’তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে স্বপ্ন দোষের দ্বারা ই’তিকাফ ভঙ্গ হবে না।

ই’তিকাফ অবস্থায় করণীয়:
ই’তিকাফ অবস্থায় সর্বদা ভালো ও সাওয়াবের কাজ‌‌‌ করতে হবে। ই’তিকাফ অবস্থায় নিম্নোক্ত কাজগুলো করার চেষ্টা করতে হবে।
১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাত সহকারে পড়া।
২. কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করা।
৩. দরুদ শরীফ পাঠ করা।
৪. জিকির-আজকার করা।
৫. দ্বীনি কিতাবাদি স্টাডি করা।
৬. দ্বীনি কিতাবাদি রচনা করা।
৭. ফিকহ-ফতোয়া নিয়ে গবেষণা করা।
৮. কুরআন ও হাদিসের দরস প্রদান করা।
৯. দ্বীনি ইলম অর্জন করা।
১০. দ্বীনি ইলম অর্জনে সময় ব্যয় করা‌।

ই’তিকাফ অবস্থায় নিষিদ্ধ কার্যাবলী:
ই’তিকাফ অবস্থায় নিম্নোক্ত কাজগুলো করা থেকে বিরত থাকা মুমিনদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
১.কোন ওযর ছাড়া পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছেড়ে দেয়া।
২. অনর্থক কথা-বার্তা বলা।
৩. দুনিয়াবী কথা বলা।
৪. ব্যবসা বানিজ্য করা।
৫. প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়া।
৬. পারিবারিক কাজ-কর্ম করা।
৭. অহেতুক সময় নষ্ট করা।
৮. ইবাদত-বন্দেগী না করে চুপচাপ বসে থাকা।
৯. মোবাইল কারো সাথে দুনিয়াবী কথা বলা।
১০. ইবাদত-বন্দেগী না করে ঘুমিয়ে থাকা।

সমাপনী:

পরিশেষে বলতে চাই, ই’তিকাফ মাহে রমজানের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত, যা পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে কেউ একজন আদায় করে দিলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। অনাদায়ে সকলে দায়ী ও গুনাহগার হিসেবে গন্য হবে। আসুন, এই পবিত্র ও ইবাদতের মাস মাহে রমজানে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে জীবনে একবার হলেও মাহে রমজানের ই’তিকাফ আদায় করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ দান করেন এবং এর মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের অশেষ কল্যাণ লাভ দান করেন। হে আল্লাহ! আমাদেরকে জীবনে একবার হলেও ই’তিকাফ থাকার তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক:
সহকারি মাওলানা,
চরণদ্বীপ রজভীয়া ইসলামিয়া ফাযিল (ডিগ্রি) মাদরাসা, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম।
এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

#chattrasenacentral #IT_Cell_Sena

Leave a Reply