You are currently viewing মদিনাতুত তায়্যিবাহ

মদিনাতুত তায়্যিবাহ

(ছাত্রবার্তায় প্রকাশিত নির্বাচিত প্রবন্ধ)

মদিনাতুত তায়্যিবাহ
মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন
____________________

-ধূসর মরুর বুকে উষর এক নগরী। আরবের তপ্ত মরুভুমির অখ্যাত এক ভূমি। নাম তার ইয়াসরিব। নাম শুনলেই বুঝা যায় কেমন নগর এটি। ইয়াসরিব অর্থ ফ্যাসাদ, ধ্বংস। নামরকরণ এমন হওয়ার অবশ্যই কারণ আছে। শহরটি ছিল রোগ-বালাই, অসুখ-বিসুখের আঁতুড়ঘর। সুস্থ মানুষ গেলে অসুস্থ হয়ে ফিরে আসতো। জীবন-যাপন খুবই অসহ্য আর কষ্টসাধ্য ছিল। ছিল মানুষের অপছন্দের তালিকায়।

-সময়টা আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বৎসর আগের। সেই অনুর্বর, অখ্যাত, উষর মরুর বুকে আগমন করেন এক মহাপুরুষ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, নবীয়ে রহমত হুজুর মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মাহে রবিউল আউয়াল এর বারোতম দিবসের জুমাবার, পবিত্র মক্কায়ে মুকাররমা থেকে হিজরত করেন মদিনায়ে মুনাওয়ারায়। যাঁর কদম মুবারকের পরশে বদলে যায় মদিনায়ে পাকের চিত্র। বদলে যায় আবহাওয়া, পরিবেশ। সাথে-সাথে মানুষের মন-মানসিকতা। সামান্য এক অখ্যাত জাতি থেকে মদিনাবাসী হয়ে গেল সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জাতিতে। শহরটিও হয়ে গেলে সর্বোত্তম শহর। আরবের অনুর্বর, অপরিচিত এক মরু এলাকা হয়ে গেল স্বর্গের একটি টুকরো।

-এতোদিন নাম ছিল ইয়াসরিব। কিন্তু রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কদম মুবারকের সদকায় হয়ে গেল মদিনাতুর রাসুল, মানে রাসুলের শহর। মদিনাতুত তায়্যিবাহ, মদিনায়ে মুনাওয়ারা, মদিনাতুত তাবা, মদিনায়ে পাক, পবিত্র শহর। ইমানের বাড়ি, ইশকের দরিয়া, ভাগ্যের শহর। নবিয়ে দো-জাহান সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় জবান মুবারকে বলেন, “ইসলামের দূর্গ, ইমানের বাড়ি, হালাল-হারামের উৎসস্থল।” এতদিন নাম শুনলে মানুষ অবজ্ঞা করতো। কিন্তু এখন নাম নিতে গেলেই মনের অজান্তে চলে আসে ভালোবাসা, সম্মান আর আদব। ইয়াসরিব বললেই গুনাহ হবে। কেউ যদি একবার বলেও ফেলে তবে কাফফারা দিতে হবে, দশবার বলতে হবে মদিনা, মদিনা।

– এই বিশ্ব-ভূবনে সম্মান আর মর্যাদায় মদিনায়ে পাকের সমকক্ষ আর কোনো শহর নেই। মদিনায়ে তাবা শহরে মহামহিমের যে রহমত, বরকত তা অন্য কোনো শহরে নেই। এমনকি সরকারে দো-আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার চাইতে দ্বিগুণ বরকত দেওয়ার জন্য রবের নিকট দোয়া করেছিলেন। পৃথিবীর বুকে যতো শহরে, নগরে মানুষ বসবাস করে তার চাইতে মদিনায়ে পাকে বসবাস করাই উত্তম। কেননা নবিয়ে রহমত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, “ইরাক, ইয়েমেন ও সিরিয়া বিজিত হবে। কিছু লোক সুখের আশায় মদিনা শরিফ ছেড়ে সেথায় গিয়ে বসবাস শুরু করবে। অথচ মদিনা পাকই তাদের জন্য উত্তম ছিল।”

—–কবি নজরুল তাইতো বলেছেন,
আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ
এই পথে মোর চলে যেতেন নুর নবী হজরত।

– রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছিলেন- যদি সম্ভব হয় মদিনায়ে পাকে মৃত্যুবরণ করতে। যাতে নবীজীর সুপারিশ নসীব হয়। হজরত ফারুকে আজম রাদ্বিআল্লাহু আনহু রবের দরবারে ফরিয়াদ করতেন যাতে পবিত্র মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন।

-সেই মদিনায়ে তায়্যিবায় রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজা মুবারক। যেথায় প্রতিনিয়ত হরহামেশা লক্ষকোটি মুমিন অগণিত, বেশুমার দরুদ আর সালামের হাদিয়া প্রেরণ করেন। আসমানি ফেরেশতারা রওজা পাকের চতুর্দিকে ঘুরে-ঘুরে দরুদ আর সালাম পাঠ করেন। আশেকগণ সেই মদিনা পাকের ধ্যান করেন, অন্তরে মদিনার উপস্থিতি অনুভব করেন। তখন ক্বলবের মধ্যে এক ধরণের স্বর্গীয় অনুভূতি চলে আসে; অন্তরের শীতলতা অনুভূত হয়।

– কারণ, প্রেমের নহর যে এখান থেকেই শুরু, প্রেমাষ্পদ যে এই মদিনা পাকে আরাম ফরমাচ্ছেন। নিজের জীবনের চাইতেও প্রিয়, প্রিয়তম যে এই মদিনায়। তাই তো প্রেমিকগণ রবের দুয়ারে সর্বদা একটাই মিনতি করে। যেন, মৃত্যুর আগে সেই প্রিয়তমের প্রেম কাননে একবার ঘুরে আসতে পারে।

-না, অবাক হবার কিছুই নেই। ইমানের দাবি যে এটাই। মদিনায়ে পাককে ভালো না বাসলে পূর্ণ ইমানদার হওয়া যাবেনা। ইমান যে এই মদিনা হতেই জন্ম লাভ করেছে, আবার এখানেই ফিরে যাবে শেষ জামানায়। যেমনিভাবে বিষাক্ত সর্প গর্তে ফিরে যায়। ইমানের কেন্দ্রবিন্দু যে মদিনা শরিফ। ঝর্ণা যেমন পাহাড়, বন-জঙ্গল, বন্ধুর পথ পেরিয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশে যায়, তেমনি বিশ্বের তামাম মুমিন মদিনার প্রেমে পাগলপারা হয়ে যান। দেহখানি হয়তো শত-হাজার মাইল দূরে থাকে; কিন্তু ক্বলব, অন্তর সর্বদা মদিনায়ে পাকে তথা রহমতুল্লাহি আলামিন এর কদম মুবারকে পড়ে থাকে। ক্বলবে সর্বদা জারি থাকে মদিনাওয়ালা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর দরুদ-সালাম।

——-তাই তো এক প্রেমিক বলেন,
সোনার মদিনা বহু দূরে
কিন্তু মদিনাওয়ালা আমার অন্তরে।
আমার অন্তর-গভীরে মদিনা আছে রে
মদিনা-মদিনা বলে জিকির করে রে।

লেখক-
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়,
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক,
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা, হাটহাজারী উপজেলা (উত্তর)।

#chattrasenacentral #IT_Cell_Sena

Leave a Reply