নিরক্ষরতা দূরীকরণে মাতৃভাষার অবদান; প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

You are currently viewing নিরক্ষরতা দূরীকরণে মাতৃভাষার অবদান; প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

এইচ এম আবছারুণ নাঈম মুন্না

____________________________________

**ভূমিকা**

আমরা জানি অক্ষর জ্ঞান যার নেই সেই হল নিরক্ষর। যার অক্ষর জ্ঞান নেই সে তো চোখ থাকতেও অন্ধ, প্রতি পদক্ষেপে যাই পিছিয়ে। এই নিরক্ষরতা দূর করতে হলে আমাদের সকলকে এগিয়ে আস্তে হবে, আর এগিয়ে নিয়ে আস্তে হবে আমাদের সকল শিক্ষার্থীদের।

পৃথিবীতে অসংখ্য ভাষা ও উপভাষা রয়েছে, বাংলা ভাষাও তাদের মধ্যে একটি অধিক ব্যবহৃত ভাষা। এই ভাষা সাধারণ কোন ভাষা নয়। আজ থেকে তেরোশত বছরের পুরাতন ভাষা আমার মাতৃভাষা। চর্যাপদ এ ভাষার আদি নিদর্শন। অষ্টাদশ শতক থেকে বাংলায় রচিত সাহিত্যের বিশাল ভান্ডারের মধ্যে দিয়ে অষ্টাদশ শতকের শেষে এসে বাংলা ভাষা তার বর্তমান রূপ পরিগ্রহণ করে। সেই চর্যাপদ থেকে এই পর্যন্ত বাংলা ভাষার পরিধি বিকাশিত হতে থাকে। দেশ ভাগের পর থেকে ভাষা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, পৃথিবীতে এমন কোন ভাষা নেই যার জন্য সেই ভাষাপ্রেমিকরা প্রাণ দিয়েছে। ১৯৪৭ থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত অনেক ষড়যন্ত্র চলে বাংলা ভাষাকে রোখে দেওয়ার জন্য। বাঙালি জাতি ছিল নাছোড়বান্দা, পিছু হটার পাত্র ছিল না। অবশেষে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বাঙলার স্বাধীনতা এনেছে।

**সংজ্ঞা**

পড়তে বা লিখতে অক্ষম হওয়া, যার মধ্যে অক্ষর জ্ঞান নেই তাকে নিরক্ষর বলে।
নিরক্ষর বলতে বুঝাই, অক্ষর জ্ঞানহীন প্রতিটি ব্যাক্তিকে নিরক্ষর বলে। নিরক্ষরতা সারা বিশ্বের একটি বড় সমস্যা।

অ্যান মারি ট্রামেলের মতে বিশ্বব্যাপী ৮৮০ মিলিয়ন জনকে অশিক্ষিত হিসাবে লেবেল করা হয়াছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুমান করা হয় যে প্রায় ৯০ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্কা কার্যকরীভাবে অশিক্ষিত।

**মাতৃভাষা কাকে বলে**

মাতৃভাষা অর্থাৎ মায়ের ভাষা। মায়ের কাছ থেকে আমরা যে ভাষা শিখি তাই হলো মাতৃভাষা। আমরা নানানরকম অঙ্গভঙ্গি বা ইঙ্গিতের সাহায্যে একে অপরকে প্রকাশ করত কিন্তু এগুলো ভাষা নয় কারণ এর মাধ্যমে মনের ভাব সম্পূর্ণ ভাবে প্রকাশ করা যায় না।

ভাষা বলা হয়,

বাগযন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অঅর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে মানুষের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকে ভাষা বলে।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, মনুষ্য জাতি যে ধ্বনি বা ধ্বনি সকল দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করে তাকে ভাষা বলে।

**ভাষার বৈশিষ্ট্য**

মানুষের আগমনের বহুকাল পরে ভাষার সৃষ্টি হয়। আগেরকার মানুষ নানানরকম অঙ্গভঙ্গি বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করত কিন্তু এগুলো ভাষা নয়।
ভাষার বৈশিষ্ট্য,
* কন্ঠনিঃসৃত ধ্বনির সাহায্যে ভাষার সৃষ্টি হয়।
* ভাষার অর্থদ্যোতক থাকতে হবে।
* সব ধরণের ধ্বনিই ভাষা হতে পারে না। যেসব ধ্বনি বাগযন্তের সাহায্যে উচ্চারিত হয়, শুধু সেগুলোই ভাষা সৃষ্টি করে।
*ভাষা বহুজনবোধ্য
*ভাষা একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ও ব্যবহৃত হয়।

**নিরক্ষরতা কি?**

নিরক্ষরতা শব্দটি একটি সমাজের পড়া এবং লেখার বিষয়ে নির্দেশনার অভাবকে বুঝায়। এটি গ্রীক উত্সর শব্দ, যা প্রত্যাখ্যানকে নির্দেশ করে। নিরক্ষরতার অভিশাপ দেশ জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। নিরক্ষর ব্যাক্তিই নিরক্ষর নামক ব্যাধির প্রবণতার প্রতিনিধিত্ব করে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নিরক্ষরতা একটি সামাজিক সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল কারান এটি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিকাশকে সীমাবদ্ধ করে। আজকের সমাজে নিরক্ষরতা সামাজিক সন্নিবেশ, শ্রম, অংশগ্রহণ, এবং উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে একটি বাস্তব সমস্যার প্রতিনিধিত্ব করে। ক্রামিক বিচারের এবং অবস্থানে সারা বিশ্বের ভাষাগুলোর মধ্যে পঞ্চম, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলে।

**নিরক্ষরতার পিছনে স্বার্থবাদী মানুষ**

স্বার্থপর মানুষ স্বার্থসিদ্ধির জন্য, অনেক মানুষ আছে যারা নিজরা ভোগ সুখে থাকার জন্য অপরকে সাক্ষর হতে দেয়নি। তারা শোষণের হাত কায়েম করার জন্য শিক্ষাকে করেছে সীমাবদ্ধ তার ফলে অধিকাংশ মানুষের কাছে নেমে এসেছে নিরক্ষরতার অভিশাপ।

**সাক্ষরতার দরকার**

গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য আমাদের উচিত সারা দেশ জুড়ে নিরক্ষরতা দূর করা, কারণ এখন নবযুগ এসেছে, চিন্তাভাবনা বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে। আমাদের দেশের কৃষক ও নিম্ন শ্রেণী মানুষের বাচ্চারা নিরক্ষরতার সমুদ্রে ডুবে আছে। তারা মান্ধাতা আমলের পদ্ধতিকে অনুসরণ করে চলছে। তাদের চিন্তাভাবনার মধ্যের কুসংস্কারে চেয়ে গেছে। তাই শিক্ষিত সমাজকে এগিয়ে আস্তে হবে এবং সমাজের অবহেলিত অশিক্ষিত কিশোর কিশোরীদের শিক্ষার আলোর আওতায় আনতে হবে।

**সাক্ষরতার ধাপ**

নিরক্ষরতার অন্ধকার কে দূর করতে হলে জাতি-ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে, এজন্যে চাই গণশিক্ষা ও সর্বজনীন শিক্ষা। শিক্ষার প্রথম ধাপ হলো অক্ষর জ্ঞান, যার মাধ্যমে মানুষ আলোকিত হয়। তাই কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন। লেখাপড়া হেরায় সেই রাস্তা। যেমন একটি প্রদীপ থেকে অনেক প্রদীপ জ্বালানো যায়, তেমনি আমরা যদি একজনকে শিক্ষিত করতে পারি অথবা নিরক্ষরতা দূর করতে পারি, ফলে একজন থেকে আরও অনেককে শিক্ষিত করতে পারবে। কোন এক দার্শনিক বলেছেন, আমাকে একটা শিক্ষিত মা দাও, আমি একটা উন্নত জাতি উপহার দিব। যেমন কিউ আতর বা সুগন্ধি লাগালে তার সুভাষ চার পাশে ছড়িয়ে পড়বে। অবহেলিত নিরক্ষর সমাজের লোকদের শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে নিরক্ষরতা দূর করতে হবে।

**সাক্ষরতাও দেশের সম্পদ**

সাক্ষরতা দেশের সম্পদ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে সাক্ষরতার আওতায় আনতে হবে। একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম এই দেশের এমপি, মন্ত্রী, মেয়র, চেয়ারম্যান, মেম্বার এদের অশিক্ষিত অনেকের অক্ষর জ্ঞান নেই, আমি দেখেছি তার অক্ষর জ্ঞান নেই, সে সীল ব্যাবহার করে দাপ্তরিক কাজ করে। তারা দেশ ও জাতির অভিভাবক, তারা যদি বকলম হয়, লিখতে, পড়তে, বলতে না পারে তাদের থেকে দেশ জাতি সমাজ কি সুফল পাবে?

তাই ৫-১১ বছরের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা খুব জরুরী। কথায় আছে, যে জাতি বা সম্প্রদায় যত বেশি শিক্ষিত যে জাতি বা সম্প্রদায় তত বেশি উন্নত। সাক্ষরতা অর্থনৈতিক উন্নতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। অর্থনৈতিক উন্নতি ও সামাজিক উন্নতির জন্য প্রাথমিক শিক্ষা কর্ম উপযোগী শিক্ষার আওতায় আনা খুবেই দরকার।

**বাংলা ভাষার বয়স**

বাংলা ভাষা বিকাশের ইতিহাস তেরোশত বছরের পুরানো। চর্যাপদ বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন। অষ্টম শতক থেকে বাংলায় রচিত সাহিত্যের বিশাল ভান্ডারের মধ্যে দিয়ে অষ্টাদশ শতকের শেষে এসে বাংলা ভাষা তার বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করে। ১৯৮৭ সালে বাংলা প্রচলন আইন বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রিয় কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়াছে।

**একাধিক দেশ বা অঞ্চলের ভাষা বাংলা**

বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশের ভাষাও বাংলা। বাংলা ভাষার নিশান আজ সারা বিশ্বে উড্ডীয়মান। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভূমিকায় মুগ্ধ হয়ে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সিয়েরা লিওন সরকার বাংলা ভাষাকে সেই দেশের দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমাত তেজান কাব্বাহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নির্মিত একটি ৫৪ কি.মি সড়ক উদ্বোধন কালে এই ঘোষণা দেন। বাংলা বিশ্বের চতুর্থ বহুল ব্যবহৃত ভাষা। বিশ্বের ত্রিশ কোটিরও বেশি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, এদের মধ্যে ছাব্বিশ কোটিরও বেশি বাংলা ভাষাভাষীর লোক বসবাস করে বাংলাদেশ ও ভারতে। কয়েক্টি দেশ বা রাজ্যের দাপ্তরিক ভাষা বাংলা, বাংলাদেশ, সিয়েরা লিওন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ত্রিপুরা, আসামের বরাক উপত্যকা করিমগঞ্জ, কাছাড় ও হাইলাকান্দি জেলার প্রধান দাপ্তরিক ভাষা।

**আমাদের মাতৃভাষার অবদান**

বিশ্বের প্রতিটি জাতির নিজস্ব একটি ভাষা রয়েছে, সেই নিজস্ব ভাষায় তারা মনের ভাব প্রকাশ করে। তেমনিভাবে আমাদেরও একটি নিজস্ব ভাষা আছে, তাকে আমরা মাতৃভাষা বলি, কারণ এই ভাষা সর্বপ্রথম আমরা মায়ের মুখ থেকে শুনি। সেই ভাষা পরে আস্তে আস্তে রপ্ত করেছি। দেশে রাষ্ট্রীয় ভাষার পাশাপাশি আরো অনেক ভাষা আছে। যা আমাদের আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা। এই ভাষাই আমরা মনের ভাব প্রকাশ করি। আমরা বাংলা ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করি তাই আমাদের বাঙ্গালী বলে। আমরা সারা বিশ্বে বাঙ্গালী নামে পরিচিত। পৃথিবীরতে একমাত্র বাংলা ভাষা যা রক্তের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। এই ভাষা শুধু আমাদের মুখের ভাষা নয়, আমাদের রক্তের মাধ্যমে মিশে আছে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিনিময় আর সহস্র মা’বোনের ইজ্জতভ্রষ্টের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনভাবে সেই ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করছি।

লক্ষ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে, বাংলা ভাষার মান রাখলো যারা, আমরা তাহাদের ভুলবো না, আমরা তাহাদের ভুলবো না।

সহস্র মা’বোনের ইজ্জতভ্রষ্টের বিনিময়ে আমরা এই বাংলায় স্বাধীনতা পেয়েছি। আমরা তাহাদের ভুলবো না।

এই ভাষা আমাদেরকে আবার নতুন করে জেগে তুলেছে। আমরা স্বাধীনভাবে চলছি। বিশ্বের আনাচে কানাচে বাংলা ভাষার সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে।

**উপসংহার**

পরিশেষে বলা যায়, বাংলা ভাষা বা মাতৃভাষার গুরুত্ব অনেক। নিরক্ষরতা দূরীকরণে মাতৃভাষার জ্ঞান অর্জন করতে হবে। নিরক্ষর সমাজের একটা ভাইরাস যা দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এই ধ্বংসের হাত থেকে জাতিকে বাঁচতে হবে, না হয় এই রোগ পুরো জাতিকে ধ্বংস করে দেবে। নিরক্ষর দূর করার জন্য আমাদের যা যা প্রয়োজন এবং নিরক্ষরতার পিছনে যে বিষয় গুলা দায়ী সেই বিষয় গুলার সমাধান বের করতে হবে। এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণে সকলকে জোড়ালোভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষা ব্যাবস্থাকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।

লেখক-
অনুগামী সদস্য,
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা।

#chattrasenacentral #IT_Cell_Sena

Leave a Reply