You are currently viewing ছাত্ররাজনীতির গৌরব ও আজিকার বাসি সৌরভ

ছাত্ররাজনীতির গৌরব ও আজিকার বাসি সৌরভ

ছাত্ররাজনীতির গৌরব ও
আজিকার বাসি সৌরভ
—————————–
ছাত্ররাজনীতি বলতে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে, শিক্ষা বিষয়ক কোনো অসংগতিতে প্রতিবাদ করতে যে রাজনীতি ভূমিকা রাখে, তাকে বোঝায়।
ব্যাপকার্থে সমাজ ও রাষ্ট্রের যে-কোনো অব্যবস্থাপনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তর্জনীর প্রতিবাদী নৃত্য প্রদর্শনে ও বজ্রধ্বনিতে অনিয়ম-উছৃঙ্খল দৃঢ় প্রাচীরে চিড় ধরাতে, ধ্বসে দিতে যে রাজনীতি কাজ করে তাই ছাত্ররাজনীতি।
ছাত্ররাজনীতি হবে লক্ষ-লক্ষ ছাত্রজনতার হৃদ-কুটিরে সুপ্ত লাভার মতো জ্বলন্ত প্রতিবাদী আগুনের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে অন্যায়-অবিচারের আয়েশি তোষককে ভষ্ম করার হাতিয়ার। নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করতে নয়; বরং জাতীয় স্বার্থে মন-প্রাণ উজাড় করে দেশের তরে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ায় প্রকৃত ছাত্ররাজনীতির বৈশিষ্ট্য।
ছাত্ররাজনীতির আছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ছাত্ররাজনীতিই বাংলাদেশের ইতিহাসকে নব-নব রঙ্গে রাঙ্গিয়েছে; সৃষ্টি করেছে নতুন নতুন মোড়, জাতিকে উপহার দিয়েছে সম্ভাবনাময় ভোর। এর ফলে জাতি আঁধারে পেয়েছে আলোর দিশা। ১৯৪৮-৫২ সালে ছাত্ররা ভাষার প্রতি যে হৃদপ্রীতি দেখিয়েছে তার নজির বিশ্বে বিরল। স্বৈরাচার আইয়ুবের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা।১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবিকে দেশের প্রতিটি ঘরে-ঘরে পৌঁছে দিতে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসক আইয়ুবের পতনও ঘটেছিল ছাত্রসমাজের হাতে। এভাবে ছাত্রসমাজের চূড়ান্ত আন্দোলনের ফলে ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। নির্বাচনে বাঙ্গালীর নিরংকুশ বিজয় মেনে না নিয়ে তাল-বাহানা করলে ছাত্রজনতা আরো দৃঢ় চেতনায় এক দফা এক দাবিতে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়।
শুরু হলো ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধ। তাতেও অসামান্য ভূমিকা রাখে ছাত্রজনতা। স্বাধীনতার পর ছাত্ররাজনীতিতে কিছুটা অসংগতি ও আদর্শচ্যুতির চিহ্ন ফুটে উঠে। তারপর ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তাঁরা ফের গর্জে উঠে চিরচেনা রূপে। এরশাদ হারায় তার খায়েশি মসনদ।
বর্তমান ছাত্ররাজনীতি তার আদর্শ ও স্বকীয়তা হারিয়েছে ক্ষমতার নেশা ও স্বার্থের মোহে। আজ ছাত্ররাজনীতি নিছক ক্ষমতায় উঠার সিঁড়ি। ছাত্ররাজনীতিতে প্রতিবাদী আওয়াজের স্থলে জায়গা করে নিয়েছে অমুক ভাই, তমুক ভাইয়ের তোষামোদি স্লোগান। বর্তমানে ক্ষমতা বিলাস, পদ-পদবী ও অন্যায় স্বার্থ হাসিলের প্রলোভন থেকেই ছাত্ররাজনীতির উন্মেষ বলেই লুটপাট, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, নারীর সম্ভ্রম হরণ, শিক্ষকদের লাঞ্ছনা, হল-দখল, সহপাঠী খুন ও প্রভাব বিস্তার করা ছাত্ররাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যে রূপ নিয়েছে। ছাত্রদের অধিকার নিয়ে ভাবার সময়টা তাদের আছে কই?
৭১’র পূর্বে তো এমন ছিলনা; তবে কেন এখন এমন হলো?
৭১’র পূর্বে ছাত্ররাজনীতিতে ছিল অধিকার আদায়ে বন্দুকের নলের মুখে বুক ফুলিয়ে কথা বলার সৎ সাহস। তাঁদের চোখে-মুখে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন- যা কারো ব্যাক্তি স্বার্থ নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ। তাই স্বাধীনতা অর্জনে ছাত্রসমাজসহ ঝাঁপিয়ে পড়ে আপামর জনতা।
দেশ স্বাধীন হলো; ছাত্ররাজনীতি হারালো তার ছন্দ। ছাত্ররাজনীতি জাতীয় স্বার্থে নয়; ব্যাক্তি স্বার্থে, তথা ক্ষমতায় টিকে থাকতে বলয় সৃষ্টিতে ব্যবহার হওয়া শুরু করলো।ছাত্রদের নাসিকায়ও গন্ধ পৌঁছে যায় স্বার্থের। আদর্শের বিচ্যুতিতে তারাও রাজনীতিতে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কষতে থাকে।যেখানে গণতন্ত্র অপূর্ণতায় ভোগে সেখানে স্বার্থ আদায়ের রাজনীতি ঠাঁই করে নিবে- এটাই স্বাভাবিক। আদর্শিক রাজনীতি সেখান থেকে নির্বাসিত।কেউ উন্নয়নের জোয়ার তুলে, কেউবা আবার গণতন্ত্রের ঝাঁঝ তুলে ছাত্রসমাজকে ব্যবহার করছে জাতীয় স্বার্থ বাদে নিজ স্বার্থ আদায়ের নোংরা খেলায়।
তাই বলি-
উন্নয়নের নামে কত চলবে লুটপাট?
গণতন্ত্রের ঝাঁঝ তুলে ক্ষমতার মিটমাট!
স্বার্থ তারা করবে হাসিল তোমায় সাথে নিয়ে
আইনি প্যাঁচে খেলে ধরা খোঁজ নিবেনা গিয়ে।
ছাত্ররাজনীতির এই দুরবস্থা হতে উত্তরণের উপায় নেই?
হ্যাঁ, তা অবশ্যই আছে। সম্ভাবনা ক্ষীণ; তবে আমরা আশাবাদী। তাদের চেতনার বোধোদয়ের অপেক্ষায়, যারা স্বার্থ আদায়ের নোংরা খেলায় গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অবলীলায়; ভবিষ্যৎ কে যারা ঠেলে দিচ্ছে বিদঘুটে অন্ধকার পথে। ছাত্ররাজনীতিতে যেদিন জাতীয় স্বার্থ প্রাধান্য পাবে, সেদিন তা ফিরে পাবে তার স্বকীয়তা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন হবে সন্ত্রাস-দখলদারমুক্ত জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার নিরাপদ ঠিকানা।
আহ্বান-
তোমারী পথ পানে আছি মোরা চেয়ে,
হে ছাত্রজনতা!
গর্জনে তোমার রুখে দাও জাতির সাথে
যত সঠতা।
বোধোদয়ের দোলায় তব চেতনা তোমার
আসে গো যদি ফিরে,
ধুয়ে-মুছে যাবে যত অনিয়ম উছৃঙ্খল
ছাত্রজনতার ভিড়ে।
মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল জাবের
বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক(চট্টগ্রাম),
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা, কেন্দ্রীয় পরিষদ।

Leave a Reply